ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর অভিযানে কয়েক ঘণ্টা আগে অপহরণের ঘটনাটি ঘটে, এর আগে তিনি দেশটিতে নিযুক্ত চীনের বিশেষ দূতের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক পুনঃবিন্যস্ত করা হয়। তবে এই ঘটনার পর থেকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং দেশটিতে চীনের বিপুল বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে আটক করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কেবল লাতিন আমেরিকায় নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে চীনকে নিজের প্রভাব বিস্তার করানোর সুযোগ করে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরুজ্জীবিত করেছেন উনবিংশ শতাব্দীর মনরো দর্শন, যা পশ্চিম গোলার্ধে একচ্ছত্র মার্কিন প্রভাব প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে। তার সাম্প্রতিক জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ইউরোপের পরিবর্তে চীনের প্রভাব মোকাবেলাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই নীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পশ্চিম গোলার্ধ চায়, যেখানে ‘বহিরাগত শক্তির নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব থেকে মুক্ত’ হওয়া সম্ভব— যা স্পষ্টতই চীনের বিরুদ্ধে ইঙ্গিত দেয়। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেনেজুয়েলাকে তেল উৎপাদনের অনুমতি দেওয়ার পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র চীন, রাশিয়া, ইরান ও কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার শর্ত আরোপ করছে। হোয়াইট হাউস এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কিছু নিশ্চিত করেনি। চীন মাদুরো অপহরণের ঘটনাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে নিন্দা জানিয়েছে এবং ওয়াশিংটনকে ভেনেজুয়েলায় সরকার উৎখাতের অপপ্রয়াস বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনাটি লাতিন আমেরিকায় চীনের বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বের সীমারেখা স্পষ্ট করে দিয়েছে। জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সিমোনা গ্রানো মন্তব্য করেন, এই ঘটনা চীনের জন্য দ্বৈত বার্তা পাঠাচ্ছে। একদিকে লাতিন আমেরিকায় চীনের উপস্থিতির দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রভাব বলয়’ যুক্তি পূর্ব এশিয়ার, বিশেষ করে তাইওয়ানের প্রেক্ষাপটে চীনের অবস্থানকে আরও জোরদার করতে পারে। চীন তাইওয়ানকে নিজস্ব ভূখণ্ডের অংশ দাবি করে থাকে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের কথাও বলে। যদিও আগামী দিনে সামরিক হামলার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে, তবে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান ভবিষ্যতে এমন পদক্ষেপের জন্য এক ধরনের যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। এই ঘটনাটি চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। অনেকে তাইওয়ানের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তুলনা টেনে বলেছেন, শক্তিশালী রাষ্ট্র ছাড়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে টিকে থাকা কঠিন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর অপসারণ চীনের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে না, তবে স্পষ্ট হতে পারে যে লাতিন আমেরিকায় চীনা বিনিয়োগ এখন আগের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে। তবুও নিষ্ক্রিয় না থেকে ঝুঁকি কমানোর জন্য বেইজিং এক ধরনের সতর্কতা ও কৌশলের দিকে নজর দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র: আল-জাজিরা।
Leave a Reply